প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০১:২৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে কেন বিজয় হিসেবে দেখছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন সমঝোতা স্মারককে কেন্দ্র করে তেহরান একে কোনো ধরনের পিছু হটা নয়, বরং ‘প্রতিরোধ ও কূটনৈতিক বিজয়ের ফল’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। যুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তির মধ্যেও সরকার এই চুক্তিকে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কঠিন বাস্তবতা ও দেশের ভেতরের ভিন্নমত এই ‘বিজয়ের বয়ান’-কে সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলা তেহরানের জন্য সহজ হবে না।

দেশটি সদ্য একটি যুদ্ধ পার করেছে যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অর্থনীতি তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশ কয়েক মাস ধরেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে। দেশের ভেতরে ও বাইরে এমন ইরানিরাও রয়েছেন, যারা এই সংকটকে কূটনীতির মুহূর্ত নয়, বরং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেন। এই বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই তেহরান এখন এই চুক্তিটি গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করছে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চুক্তিটিকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আলোচনায় প্রধান ইরানি ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এটিকে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সমঝোতাকে 'সম্ভাব্য রূপান্তরকারী' হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ইরানের বহু সমস্যা সমাধান হতে পারে এবং ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে ‘এক ভিন্ন পৃথিবী তৈরি করতে পারে’।

গালিবাফের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাকে পেজেশকিয়ানের মধ্যপন্থি শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখা হয় না; তার প্রকাশ্য সমর্থন ইঙ্গিত দেয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আরও শক্তিশালী অংশ, এমনকি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের ভেতরেও, এই চুক্তির পক্ষে সমর্থন আছে।

তেহরানের নেতৃত্ব এই চুক্তিকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করছে আরেকটি কারণেও। তাদের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। তারা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে পারেনি এবং হেজবুল্লার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেনি। বরং, ইরান এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে, লেবাননকে কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে সরকারের এই বর্ণনা ইরানের ভেতরেই বিতর্কের মুখে পড়েছে।

কট্টরপন্থি একজন সংসদ সদস্য, যিনি ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির ডেপুটি-চেয়ারম্যান, তিনি খসড়া চুক্তিটিকে এমন একটি নথি হিসেবে অভিহিত করেছেন বলে জানা যাচ্ছে, যা ইরানকে মার্কিন 'উপনিবেশে’ পরিণত করবে। এই সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাইরের কোনো উৎস থেকে আসেনি, বরং এটি এসেছে জাতীয় নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই।

গত কয়েক মাস ধরে পার্লামেন্টের কট্টরপন্থি সদস্যরা, রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম এবং সরকারপন্থি নিয়মিত সমাবেশগুলোতে বারবার বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না। তাদের যুক্তি, যুদ্ধ শুরুর অল্প আগে পর্যন্তও কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, আর ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি আড়াল করতে আলোচনাকে ব্যবহার করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি আপসকামিতার পরিচয় হিসেবে দেখা হতে পারে। তবে এখন এসব কট্টরপন্থি কণ্ঠগুলোকে কিছুটা নীরব দেখা যাচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদিত হয়েছে। তার মানে এই নয় যে পূর্ণ ঐক্য রয়েছে।

ইরানের নেতৃত্ব চুক্তিটিকে সামরিক চাপের ফলাফল হিসেবে তুলে ধরতে পারে—যেমন হরমুজ প্রণালি ঘিরে চাপ বা যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক জ্বালানি স্বার্থে হামলা। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও তেহরানকে বাধ্য করেছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ, তেলবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রায় সীমিত প্রবেশাধিকার, এবং অত্যন্ত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি—সব মিলিয়ে দেশ ও সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলেছে। ইরানের অনেক পরিবারের প্রশ্ন হলো- চুক্তিটি বিজয়ের মতো শোনাচ্ছে কি না, তা নয়; বরং এটি দাম কমাবে কি না এবং আরেক দফা যুদ্ধের আশঙ্কা কমাবে কি না সেটি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান সরাসরি করদাতাদের অর্থ পাবে না, তবে যদি তারা তাদের অঙ্গীকার পূরণ করে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তাহলে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রবেশাধিকার পেতে পারে। এতে তেহরান চুক্তিটিকে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা নয়, বরং বিনিয়োগ ও পুনর্গঠনের পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। তবুও ঝুঁকি স্পষ্ট। সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত এখনও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো- ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, অনুমোদিত সমৃদ্ধির মাত্রা, যাচাই-বাছাই, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, হরমুজ প্রণালি ও লেবানন- এগুলো এখনো আলোচনার বাকি। সেই সাথে ইসরায়েল নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল প্রত্যাহার করবে—এমন প্রতিবেদনের বিরোধিতা করে বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন, ততদিন ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে থাকবে।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে লেবাননে ইসরায়েলের কার্যকলাপের সমালোচনা করে বলেছেন সেখানে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঠিক আগে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘চমৎকার’ বলেই দাবি করেছেন। তেহরানের জন্য ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের এই দৃশ্যমান টানাপড়েন কাজে লাগে।

এটিকে এমন প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় যা ইরানের চাপ ইসরায়েলের কার্যক্রমের স্বাধীনতাকে জটিল করেছে। তবে এটিই চুক্তিটিকে ভঙ্গুরও করে তুলেছে। যদি ইসরায়েল লেবাননে অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ইরানকে প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপের মুখে পড়তে হবে।

যদি ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানের ওপর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর চাপ বাড়বে। আর যদি ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে সংযত রাখতে না পারে, তাহলে লেবানন এই সমঝোতার আওতায় রয়েছে, তেহরানের এই দাবি খুব দ্রুতই পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

বিবিসি পার্সিয়ানের পাঠক-দর্শকদের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, সরকার যে 'বিজয়ের' বর্ণনা তুলে ধরছে, তা সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সেখানে একজন বলেছেন, আরেকটি ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কায় তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু চুক্তির কথা শোনার পরও তার ‘কোনো আস্থা নেই’ এবং চুক্তি টিকে থাকলে দেশ সঠিকভাবে পরিচালিত হবে কি না তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।

আরেকজন সরকারবিরোধী ইরানি, যিনি শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন, তিনি জানতে চান- যদি এতে ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কী লাভ হলো। ‘আমাদের আশা ছিল শাসনব্যবস্থা বদলাবে। কিন্তু কষ্ট, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনীতির আরও ক্ষতি ছাড়া মানুষের কী উপকার হয়েছে?’ তবে অনেকে আবার সরকারের অবস্থানের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

একজন দর্শক ইরানকে বিজয়ী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘ভিক্ষা’ নয়, বরং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্ভব- এটি এই যুদ্ধ দেখিয়েছে। আরেকজন আরও সতর্কভাবে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এতে মানুষ কিছুটা স্বস্তি নিয়ে কাজে ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

‘আমার মনে হয় এটি অস্থায়ী। তবে কিন্তু আমাদের কয়েক মাসের জন্য দম নেওয়ার সুযোগ এবং শান্তি প্রয়োজন ছিল। সম্ভবত এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন।’

ইসলামি প্রজাতন্ত্র চুক্তিটিকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, কারণ এটিকে সহজে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কিন্তু অনেক ইরানির কাছে এর সাফল্য স্লোগানে নির্ধারিত হবে না। বরং পরিমাপ হবে- যুদ্ধ থামে কি না, পণ্যমূল্য কমে কি না, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় কি না, এবং নেতৃত্ব আরেক দফা আকস্মিক উত্তেজনা ছাড়া পরবর্তী পর্যায় সামাল দিতে পারে কি না। 

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য করুন